দেশ-বিদেশের ৯৭টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে মুখর নন্দন
প্রশান্ত সরকার: কলকাতার চলচ্চিত্র সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে শনিবার দুপুর থেকে নন্দন-৩ প্রেক্ষাগৃহে শুরু হল ১২ ও ১৩ তম সুতানুটি শর্ট ফিল্ম উৎসব। ওয়েস্ট বেঙ্গল কালচারাল সেন্টার (নন্দন), কলকাতায় আয়োজিত এই উৎসব ঘিরে চলচ্চিত্রপ্রেমী, নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও শিল্পীদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।এ বছরের উৎসবে দেশ ও বিদেশের মোট ৯৭টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র অংশগ্রহণ করেছে। পাশাপাশি প্রদর্শিত হচ্ছে ফিচার ফিল্ম, তথ্যচিত্র এবং ১৮টি গানের মিউজিক অ্যালবাম। আগামী ৩ জানুয়ারি থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই চলচ্চিত্র উৎসব, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক স্তরে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃজনশীলতা ও ভাবনার প্রকাশ ঘটছে।
এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে উঠে এসেছে সুন্দরবনের জল, জঙ্গল ও মানুষের জীবনসংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত পাল ফিল্ম প্রোডাকশন নিবেদিত ভারতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সবুজ দ্বীপের পাঠশালা’। পরিবেশ, প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে বাস্তবধর্মী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছে এই চলচ্চিত্রটি। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার জীবনযাত্রা, শিক্ষার গুরুত্ব এবং সামাজিক সচেতনতার বার্তা ছবিটির মূল উপজীব্য।
‘সবুজ দ্বীপের পাঠশালা’ ছবিটির কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনায় রয়েছেন বিশ্বজিৎ পাল। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় গল্পটি দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন সত্যজিৎ পাল, যাঁর সুর ও আবহ চলচ্চিত্রের আবেগকে আরও দৃঢ় করেছে। প্রকৃতি ও মানবজীবনের টানাপোড়েনকে সংগীতের মাধ্যমে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অভিনয়ের দিক থেকেও এই চলচ্চিত্র দর্শকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। অভিনেত্রী ঈশিতা মণ্ডল, পূজা সরদার ও রূপা সূতার সাবলীল অভিনয় ছবির চরিত্রগুলিকে বাস্তব রূপ দিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষারত্ন পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাক্তন শিক্ষক অমল নায়েক এবং প্রশান্ত সরকারের অভিনয় দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাঁদের অভিনয়ে অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এছাড়াও শিশু শিল্পী সর্বজিৎ পাল ও জীবিকা সূতারের স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় ছবিটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
এই আন্তর্জাতিক মানের শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আয়োজক সংস্থা এ.ডি. মুভিজ ইন্টারন্যাশনাল। উৎসব পরিচালক অজয় বরন দে জানান, ভারতীয় চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ হীরালাল সেন এবং বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সাংবাদিক দেবকুমার ঘোষের স্মরণে ও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতেই ১২ ও ১৩তম সুতানুটি শর্ট ফিল্ম উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হল নতুন ও প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ প্রদান করা এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজের নানা দিক তুলে ধরা।” উৎসব পরিচালক আরও জানান, সুতানুটি শর্ট ফিল্ম উৎসব শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও মানবিক মূল্যবোধকে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রদর্শিত ছবিগুলি সমাজের নানা বাস্তব সমস্যার কথা বলে, যা দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করে।
উদ্বোধনী দিনে নন্দন প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। উপস্থিত ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট পরিচালক সুশান্ত পাল চৌধুরী সহ বহু খ্যাতনামা অভিনেতা-অভিনেত্রী, চিত্রগ্রাহক, সম্পাদক ও চলচ্চিত্র জগতের নানা ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। তাঁদের উপস্থিতিতে উৎসবের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায়। উৎসব চলাকালীন প্রতিদিন বিভিন্ন বিভাগের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা ও আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়েছে। এর ফলে নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
এই বছর সুতানুটি শর্ট ফিল্ম উৎসবে ভারত ছাড়াও বিভিন্ন দেশের নির্মাতারা অংশগ্রহণ করেছেন, যা উৎসবটিকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে। বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থার গল্প এক মঞ্চে এসে মিলিত হওয়ায় দর্শকদের জন্য এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে। আগামী ৮ জানুয়ারি বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হবে এই উৎসবের সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। সেরা চলচ্চিত্র, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী সহ একাধিক বিভাগে পুরস্কার প্রদান করা হবে। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে এই পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান ঘিরে ইতিমধ্যেই বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ১২ ও ১৩ তম সুতানুটি শর্ট ফিল্ম উৎসব কেবল একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নয়, বরং এটি শিল্প, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ মিলনক্ষেত্র। নন্দনের প্রেক্ষাগৃহে এই উৎসব আগামী কয়েকদিন ধরে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য এক সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।





