নুরসেলিম লস্কর, ঝড়খালি : প্রত্যন্ত সুন্দরবনের ঝড়খালি আবারও বাঘ আতঙ্কে কাঁপছে। একদিকে গহীন ম্যানগ্রোভ অরণ্য, অন্যদিকে জনবসতি— মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা হেড়োভাঙা নদীই যেন জঙ্গল আর মানুষের পৃথিবীর সীমানা। সেই প্রাকৃতিক বাধা টপকেই একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার ভোর রাতে ঝড়খালি কোস্টাল থানার সংলগ্ন নদী-পাড় এলাকায় বাঘের স্পষ্ট পায়ের ছাপ দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীর দিক থেকে আসা সেই পদচিহ্ন লোকালয়ের ভেতর পর্যন্ত গেছে বলে দাবি করেন তাঁরা। মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে, শুরু হয় চরম আতঙ্ক। অনেকে ঘর থেকে বেরোনো বন্ধ করে দেন। সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হয় বনদফতর ও পুলিশ প্রশাসনকে।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় বনদফতরের কর্মীরা, সঙ্গে বিশাল পুলিশ বাহিনী। শুরু হয় তল্লাশি অভিযান। লাউডস্পিকারে প্রচার করে বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়। শিশু, বৃদ্ধ এবং গবাদি পশুকে ঘরের ভেতরে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যার পর অকারণে বাইরে বেরোতে নিষেধ করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ঝড়খালি পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। ফলে পর্যটননির্ভর বহু ছোট ব্যবসায়ীও উদ্বেগে রয়েছেন।
শুক্রবার সারাদিন এবং শনিবার প্রায় পুরো দিন জুড়ে তল্লাশি চললেও সরাসরি বাঘের দেখা মেলেনি। তবে বিভিন্ন স্থানে পায়ের ছাপ ও চলাচলের চিহ্ন মিলেছে বলে বনদফতর সূত্রে খবর। এতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে বাঘ এখনও লোকালয়ের আশপাশেই কোথাও লুকিয়ে রয়েছে। শনিবার বনদফতরের পক্ষ থেকে তিনটি বড় খাঁচা পাতা হয়েছে। টোপ হিসেবে রাখা হয়েছে ছাগল, যাতে বাঘটিকে প্রলুব্ধ করে ধরা যায়। পাশাপাশি সন্দেহভাজন এলাকাগুলো শক্ত জাল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। বনকর্মীরা পালা করে নজরদারি চালাচ্ছেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত রয়েছেন বনদফতরের আধিকারিকরা এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তারাও।
অন্যদিকে স্থানীয় মানুষজন চরম আতঙ্কে প্রহর গুনছেন। সন্ধ্যা নামলেই প্রায় জনশূন্য হয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের বাইরে খেলতে নিষেধ করা হয়েছে। বহু পরিবার রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন। এ বিষয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সহ বন আধিকারিক পার্থ মুখার্জী তিনি জানান, শুক্রবার বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পায় গ্রামবাসীরা এরপর তড়িঘড়ি বনদপ্তরকে খবর দেয়া হয় ঘটনাস্থলে বনদপ্তরের কর্মীরা পৌঁছে গোটা এলাকা জাল দিয়ে ঘিরে ফেলেছে। এর পাশাপাশি বাঘটিকে খাঁচা বন্দি করার জন্য খাঁচা নিয়ে আসা হয়েছে এবং ছাগলের টোপ ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের প্রাথমিক অনুমান সুন্দরবন লাগাওয়াল এই লোকালয়ে নদী পেরিয়ে বাঘ এই লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। বাঘটিকে চিহ্নিত করার কাজ শুরু করা হয়েছে এবং বাঘের পায়ের ছাপ অনুসরণ করে বাঘের গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। এখন সবার চোখ বনদফতরের দিকে কবে ধরা পড়বে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘ, আর কবে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে সুন্দরবনের ঝড়খালির জীবন।




