বিশ্ব ভ্রমণের পর সোমেন দেবনাথের নতুন করে ভারত যাত্রার প্রস্তুতি।
প্রশান্ত সরকার, বাসন্তীঃ সুন্দরবনের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক সাধারণ পরিবারের যুবক সোমেন দেবনাথ। সীমাহীন সাহস, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাকে সঙ্গী করে তিনি বিশ্বের ১৯১টি দেশ সাইকেলে ভ্রমণ করে এক অনন্য নজির গড়েছেন। দীর্ঘ ১৯ বছরের ঐতিহাসিক বিশ্বভ্রমণ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর এবার তিনি আবারও নতুন এক মহাযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আগামী ২০২৬ সালের ২৭ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৭ মে পর্যন্ত ভারতের ২৮টি রাজ্য এবং ৫টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়ে তিনি শুরু করতে চলেছেন এক বিশেষ সাইকেল অভিযান, যার মূল বার্তা — “পুনর্মিলন ভারত”, “এক বৃক্ষ এক জীবন” এবং “ভারতীয় যুবসমাজ ও ক্রীড়া”।
সোমেন দেবনাথের এই দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণের সূচনা হয়েছিল ২০০৪ সালের ২৭ মে। “এইচআইভি/এইডস সচেতনতা কর্মসূচি এবং ভারতীয় সংস্কৃতির উপর সেমিনার” — এই সামাজিক বার্তাকে সামনে রেখেই তিনি সাইকেলে চেপে বেরিয়ে পড়েন বিশ্ব জয়ের অভিযানে। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন শুধুমাত্র মানবতা, সচেতনতা এবং ভারতীয় সংস্কৃতির প্রচারের উদ্দেশ্যে। তাঁর এই অসাধারণ যাত্রার নাম ছিল “ওয়ার্ল্ড বাইকিং ওডিসি”। এই বিশ্বভ্রমণে তিনি এশিয়ার ২৮টি দেশ, ইউরোপের ৪৪টি দেশ, আফ্রিকার ৫২টি দেশ, দক্ষিণ আমেরিকার ১২টি দেশ, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ, উত্তর আমেরিকার ২৩টি দেশ এবং অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়ার ১৪টি দেশ পরিভ্রমণ করেন। শুধু দেশ ভ্রমণ নয়, প্রতিটি জায়গায় তিনি মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক মঞ্চে বক্তব্য রেখেছেন এবং এইচআইভি/এইডস সচেতনতা ও ভারতীয় সংস্কৃতির প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রায় ৭০০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যাত্রায় তিনি ২ লক্ষ কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর সময় তাঁকে বহু প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনও তীব্র ঠান্ডা, কখনও মরুভূমির প্রখর গরম, কখনও ভাষার সমস্যা, আবার কখনও আর্থিক সংকট — সব বাধা অতিক্রম করেই তিনি নিজের লক্ষ্যপূরণে অবিচল থেকেছেন। তাঁর এই লড়াই শুধু একজন সাইক্লিস্টের নয়, বরং এক সমাজসচেতন মানুষের সংগ্রামের গল্প, যিনি নিজের জীবনের বড় একটা অংশ উৎসর্গ করেছেন সমাজ ও দেশের মানুষের জন্য। ২০২৩ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং ১৬ ডিসেম্বর নিজের জন্মভূমি সুন্দরবনের বাসন্তীতে ফিরে আসেন। তাঁর ফিরে আসার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়। স্থানীয় মানুষ তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং তাঁর এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বে গর্ব প্রকাশ করেন।
তবে বিশ্বভ্রমণের আগে থেকেই সোমেন দেবনাথের যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতবর্ষের মাটিতে। ২০০৪ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে তিনি ভারতের ২৮টি রাজ্য এবং ৫টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সাইকেলে ভ্রমণ করেছিলেন। সেই সময় দেশের ২৫ জন মুখ্যমন্ত্রী এবং ২৬ জন রাজ্যপাল তাঁকে সংবর্ধনা জানান। তাঁর অসাধারণ সাহস ও সামাজিক উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালাম, প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী প্রণব মুখার্জী সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পান। তাঁদের আশীর্বাদ ও উৎসাহ তাঁর যাত্রাপথকে আরও দৃঢ় করেছে বলে তিনি মনে করেন। এবার তাঁর নতুন ভারত যাত্রার মূল লক্ষ্য শুধু ভ্রমণ নয়, বরং সমাজের মধ্যে এক ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া। “পুনর্মিলন ভারত” কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি দেশের মানুষকে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করার আহ্বান জানাতে চান। “এক বৃক্ষ এক জীবন” প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব এবং বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে চান। পাশাপাশি “ভারতীয় যুবসমাজ ও ক্রীড়া” উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের যুবকদের খেলাধুলা ও সুস্থ জীবনধারার প্রতি আকৃষ্ট করার বার্তা দিতে চান। সোমেন দেবনাথ জানিয়েছেন, আজকের দিনে যুবসমাজের মধ্যে হতাশা, বিভাজন এবং সামাজিক অবক্ষয়ের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রয়োজন ইতিবাচক চিন্তা, শারীরিক সক্ষমতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। তাঁর মতে, খেলাধুলা ও ভ্রমণ মানুষের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে। সেই কারণেই তিনি তাঁর আগামী যাত্রাকে শুধুমাত্র একটি সাইকেল অভিযান হিসেবে নয়, বরং এক সামাজিক আন্দোলন হিসেবে দেখতে চান। তিনি আরও জানান, সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিকভাবে বিপন্ন অঞ্চলের মানুষদের জন্য পরিবেশ রক্ষা আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সুন্দরবনের মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাই “এক বৃক্ষ এক জীবন” কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণের বার্তা ছড়িয়ে দিতে চান। বর্তমানে তিনি তাঁর আগামী যাত্রার পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। দেশের বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ক্রীড়া সংস্থা এবং শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখছেন। পাশাপাশি তিনি দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আশীর্বাদ ও সমর্থন কামনা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা থাকলে এই নতুন যাত্রাও সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। সুন্দরবনের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান হয়েও সোমেন দেবনাথ আজ বিশ্ব দরবারে এক অনন্য পরিচিতি তৈরি করেছেন। তাঁর জীবনসংগ্রাম ও সাফল্য নতুন প্রজন্মের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা। সমাজসচেতনতা, পরিবেশ রক্ষা এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা নিয়ে তাঁর এই নতুন ভারত যাত্রা যে দেশের মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করবে, তা বলাই যায়।
