২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী শ্যামল মণ্ডল প্রায় ৫১ হাজার ভোটে জয়লাভ করেন। এই বিপুল ব্যবধান শুধু জয়েরই ইঙ্গিত দেয়নি, বরং সংগঠনিক শক্তিরও পরিচয় দিয়েছে। এরপর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই ব্যবধান আরও বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ হাজারে। ফলে সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে শাসকদলের আত্মবিশ্বাস স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। এদিকে, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ২৫-২৬ হাজার নাম বাদ পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানকে ছাপিয়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কিন্তু বাসন্তীতে সেই পরিস্থিতি দেখা যায়নি। এখানে আগের নির্বাচনে তৃণমূলের লিড এতটাই বেশি যে, বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যাও সেই ব্যবধানকে ছুঁতে পারেনি। ফলে গাণিতিক দিক থেকে শাসকদল নিজেদের কিছুটা নিরাপদ বলেই মনে করছে।
অন্যদিকে, এবারের লড়াই চতুর্মুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজেপি, আরএসপি এবং বাম সমর্থিত আইএসএফ—সব পক্ষই প্রার্থী দিয়েছে। যদিও বাম ও আইএসএফ-এর মধ্যে জোট হওয়ায় বিরোধী ভোট একাংশে একত্রিত হতে পারে, তবুও সব বিরোধী শক্তি এক ছাতার নিচে না আসায় ভোট বিভাজনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই আংশিক বিভাজনই শেষ পর্যন্ত শাসকদলের পক্ষে যেতে পারে। বিজেপি প্রার্থী বিকাশ সর্দার, আরএসপি প্রার্থী সমর বিশ্বাস এবং বাম সমর্থিত আইএসএফ প্রার্থী অসিত রায়—তিনজনই প্রচারে জোর দিচ্ছেন এলাকার মৌলিক সমস্যাগুলির উপর। পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ঘাটতিকে তুলে ধরে তাঁরা দাবি করছেন, দীর্ঘদিনেও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। তবে তাঁদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোটের সমীকরণ, যা তাঁদের জয়ের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। যদিও বিরোধী দলগুলির বক্তব্য, মানুষ এবার পরিবর্তনের পক্ষে মানসিকভাবে প্রস্তুত এবং ভোট ভাগাভাগি ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে না। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং উন্নয়নের অভাবই ভোটের মূল নির্ধারক হয়ে উঠবে। এবারের নির্বাচনে ‘বহিরাগত বনাম স্থানীয়’ ইস্যুও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বিতর্ক এড়াতে তৃণমূল কংগ্রেস স্থানীয় ও পরিচিত মুখ নীলিমা মিস্ত্রিকে প্রার্থী করেছে। তাঁর দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতা এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিজেপি তাদের প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় ভূমিপুত্র বিকাশ সর্দারের উপর ভরসা রেখেছে। একইভাবে, আইএসএফ প্রার্থী অসিত রায়ও এলাকার মানুষ হওয়ায় এই লড়াই অনেকটাই “ঘরের লড়াই”-এ পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় ভোটারদের একাংশের মতে, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীরা সকলেই এলাকার হওয়ায় নির্বাচনের পর তাঁদের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে এবং সমস্যার সরাসরি সমাধানের আশা করা যায়। উন্নয়ন বনাম বঞ্চনার প্রশ্নও এবারের নির্বাচনে বড় ইস্যু। তৃণমূলের দাবি, গত ১৫ বছরে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধীদের অভিযোগ—এই উন্নয়নের দাবি বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে এখনও মৌলিক পরিষেবার ঘাটতি রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে, বাসন্তী বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচন এবার এক জটিল সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে। শাসকদলের শক্তিশালী পরিসংখ্যান ও সংগঠনের মোকাবিলায় বিরোধীরা তুলে ধরছে বঞ্চনার অভিযোগ ও পরিবর্তনের দাবি। তবে আগের নির্বাচনের বড় ব্যবধান এবং বিরোধী ভোটের সম্ভাব্য বিভাজন—এই দুই কারণ আপাতত তৃণমূল কংগ্রেসকে কিছুটা এগিয়ে রাখছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার, বাসন্তীবাসী তাঁদের পুরনো ধারাকে বজায় রেখে আবারও নতুন মুখকে বেছে নেন, নাকি এই নির্বাচন ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক বার্তা দেয়।



