সুন্দরবনের তথাকথিত বিধবা পল্লীর বাস্তবতা ও অপপ্রচার


সুন্দরবনের তথাকথিত বিধবা পল্লীর বাস্তবতা ও অপপ্রচার



প্রশান্ত সরকার - ঝড়খালী
সুন্দরবনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা সমাজে ছড়িয়ে রয়েছে। অনেক পর্যটক, আবার কেউ কেউ লোকমুখে বলে থাকেন—সুন্দরবনে নাকি ‘বিধবা পল্লী’ নামে কিছু গ্রাম আছে, যেখানে গ্রামের সব মহিলাই বিধবা। এই কথা শুনতে আকর্ষণীয় মনে হলেও বাস্তবে এর কোনো সত্যতা নেই।

বিজ্ঞাপন 
বাস্তব সত্য হলো—বর্তমানে তো নয়ই, অতীতেও সুন্দরবনে এমন কোনো গ্রাম ছিল না, যেখানে গ্রামের সমস্ত মহিলাই বিধবা ছিলেন। ‘বিধবা পল্লী’ কথাটি আসলে একটি বানানো শব্দ, যা কিছু মানুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। এই অপপ্রচার চালিয়ে একদল মানুষ সুন্দরবনের নাম ব্যবহার করে নিজেদের ব্যবসা, প্রচার বা সহানুভূতির সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করছে। সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা—এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততার কারণে এখানকার মানুষকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। পাশাপাশি বাঘ–মানুষ সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এসব কারণে কিছু পরিবারে স্বামীহারা নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। কিন্তু এই বাস্তবতাকে পুঁজি করে পুরো একটি গ্রাম বা অঞ্চলকে ‘বিধবা পল্লী’ বলে চিহ্নিত করা সম্পূর্ণ অন্যায় ও বিভ্রান্তিকর। এই ধরনের ভুল প্রচার সুন্দরবনের মহিলাদের সম্মান ও আত্মমর্যাদায় আঘাত করে। এতে তাঁদের জীবনকে কেবল দুঃখ আর করুণার গল্প হিসেবেই তুলে ধরা হয়। 
অথচ বাস্তবে সুন্দরবনের মহিলারা অত্যন্ত সাহসী ও পরিশ্রমী। তাঁরা শুধু সংসারের কাজই করেন না, কৃষিকাজ, মাছ ধরা, কাঁকড়া ধরা, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কাজ, এমনকি পরিবেশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডেও যুক্ত থাকেন। আজ সুন্দরবনের বহু মহিলা নদীর বাঁধ রক্ষায় ম্যানগ্রোভ চারা রোপণের কাজে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছেন। কেউ কেউ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। অনেক নারী প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ঘুরে দাঁড়িয়ে পরিবার ও সমাজকে আগলে রাখছেন। 
তাঁদের জীবন মানে শুধু কষ্ট নয়—তাতে আছে লড়াই, সাহস ও এগিয়ে যাওয়ার গল্প। তবুও কিছু মানুষ এই বাস্তব সত্য আড়াল করে ‘বিধবা পল্লী’-র মতো শব্দ ব্যবহার করে সুন্দরবনের মানুষের পরিচয়কে বিকৃত করছেন। এতে বাইরের সমাজে সুন্দরবন সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে এবং এখানকার মানুষ, বিশেষ করে নারীরা অযথা অবহেলার শিকার হচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন
সুন্দরবনকে করুণার চোখে দেখার প্রবণতা বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। দরকার সত্যকে তুলে ধরা—সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনার কথাও বলা। সুন্দরবনের মানুষ সাহায্যের মুখাপেক্ষী নয়, তাঁরা নিজেদের শক্তিতেই বারবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন। অতএব, সুন্দরবনের নামে মিথ্যা গল্প রটানো বন্ধ করা জরুরি। ‘বিধবা পল্লী’ শব্দবন্ধ নয়—সুন্দরবনের আসল পরিচয় হোক তার মানুষের সাহস, পরিশ্রম ও আত্মমর্যাদা। সত্য ও সম্মানের ভিত্তিতেই সুন্দরবনের গল্প সমাজের সামনে তুলে ধরা উচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন