সেরা মানবিক পড়ুয়া !
লেখক : সুদীপ চন্দ্র হালদার [ কবি ও গবেষক ] ।
লেখক : সুদীপ চন্দ্র হালদার [ কবি ও গবেষক ] ।
অনু ও অভি দুই বন্ধু। কলকাতার অদূরে কালিন্দী গ্রাম। শস্য-শ্যামল সবুজে ঘেরা গ্রামটি। একটি ছোট নদীও বয়ে চলেছে গ্রামের পাশ দিয়ে। নদীর নামও গ্রামের নামের সাথে মিল রেখে-কালিন্দী নদী।কালিন্দী গ্রামটি কলকাতার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত হওয়ায় এই নদীতে প্রতিদিন জোয়ার ভাটা প্রত্যক্ষ হয়। এই শ্যামল বাংলার গ্রামে বেড়ে উঠছে দুই কিশোর অনু ও অভি। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব বেশ গভীর হলেও স্বভাবে রয়েছে বেশ তফাৎ। অনু প্রাণচঞ্চল, বর্হিমুখী; অন্যদিকে অভি কিছুটা ঘরমুখী ও পড়ুয়া। দু’জনেই পড়ছে সপ্তম শ্রেণীতে। অনু স্কুল ছুটির দিনে নদীর পাড়ে যায়, লাফ দিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সাঁতার কাটে, প্রতিদিন বিকালে পাড়ার ছেলেদের সাথে স্কুলের মাঠে ফুটবল-ক্রিকেট খেলে। অভি এসবে প্রায় নেই বললেই চলে। সারাক্ষণ অভির চিন্তা ক্লাসে ফার্স্ট বয় তাকে হতেই হবে। অন্যকিছুতে সময় নষ্ট করার মতো সময় তার হাতে নেই। মা বাবাও তাকে নিয়মিত শেখাচ্ছে ঠিক একই বুলি— ফার্স্ট তোমাকে হতেই হবে। অন্য কোন কিছুতেই সময় নষ্ট করা চলবে না। এই গ্রামের একটি মাটির তৈরি কুড়েঁঘরেই থাকেন সুরভী বুড়ি। এই জগতে তার নিজের বলতে কেউ নেই। করোনার বিভীষিকা কেড়ে নিয়েছে তার একমাত্র ছেলে যক্ষের ধন পিয়াসকে। শহরে টিউশনি করে বি.এ পাশ করেছিল ছেলেটি। করোনাতে একাকী শহরের হাসপাতালেই মারা যায় ছেলেটি। এই সংবাদ শোনার পর সুরভী বুড়ি কেমন জানি আধা-পাগলী মতো হয়ে গিয়েছে। বাড়ির ভিটার কিছু শাক-সবজি, ফল-ফলাদি, ডাব, নারকেল এসব বিক্রি করেই কোন রকমে দিনাতিপাত করছেন সুরভী বুড়ি।
এই সুরভী বুড়ির প্রতি অনুর কেমন যেন অন্যরকম এক মায়া কাজ করে। সে লুকিয়ে লুকিয়ে সুরভী বুড়ির বাড়িতে যায়। বুড়ির দিনকাল কেমন যাচ্ছে সেসব নিয়ে গল্প করে, মাঝে মধ্যে দু-চার প্যাকেট বিস্কুট বুড়িকে দিয়ে আসে।একদিন সুরভী বুড়ি চাল কিনতে গিয়েছে কানু খুড়োর দোকানে। কানু খুড়োর দোকান স্কুলের মাঠের ঠিক কোণায়। অনুও বিকালে বন্ধুদের সাথে মাঠে খেলে দোকানে গিয়েছে বিস্কুট কিনতে, গিয়েই দেখতে পেল সুরভী বুড়ি চল্লিশ টাকা দরে তিন কেজি চাল দেওয়ার জন্য কানু খুড়োকে বলেই শাড়ির আঁচলে বাধা টাকা বের করে গুনছে। একটি পুরানো পঞ্চাশ টাকার নোট, একটি কুড়ি টাকা, দশ টাকার তিনটি নোট, আর দু’টাকার দশটা কয়েন; সবমিলিয়ে একশো কুড়ি টাকা। বোঝাই যাচ্ছে বুড়ি অনেক কষ্ট করে এই টাকা জমিয়েছেন। এদিকে কানু খুড়ো চাল মাপছেন। অনু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্য সময় হলে ওর তাড়াহুড়ো শুরু হয়ে যেত এতক্ষণে। কিন্তু বুড়ি চাল নিচ্ছেন দেখে একদম চুপ! কানু খুড়ো একটু ধূর্ত স্বভাবের। দাঁড়িপাল্লায় দিয়েছেন ২ কেজি ৭৫০ গ্রামের বাটখারা। আর কিছুক্ষণ পর সেই চাল তিন কেজি বলেই বুড়িকে দিয়ে তিন কেজির টাকা গুণে গুণে একশো কুড়ি টাকা নিলেন। এটা দেখে মনে মনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হল অনু। সে বিস্কুট না কিনেই দোকান থেকে বেরিয়ে এলো। আর পরিকল্পনা করতে লাগলো কিভাবে ব্যাটাকে শায়েস্তা করা যায়। ভাবতে ভাবতে ওর মাথায় বুদ্ধি এলো। ব্যাটাকে আজ রাতেই শায়েস্তা করতে হবে। কানু খুড়োর দোকানের টিনের চালে আজ রাতেই ইটের খোয়া মারতে হবে। যেই ভাবনা- সেই কাজ! ও বাড়িতে গিয়ে রান্নাঘর থেকে বাজার করার একটি ব্যাগ চুপি চুপি নিল, আর ব্যাগ ভর্তি করল পঞ্চাশটিরও বেশি ইটের খণ্ডে। কানু খুড়ো রাতের বেলা দোকানের মধ্যেই ঘুমায় চুরি হওয়ার ভয়ে; বেজায় কিপটেও বুড়ো। রাত ন’টার দিকে দোকান বন্ধ করে খেয়ে-দেয়ে দশটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে কানু খুড়ো। অনু পরিকল্পনা করলো রাত এগারোটার দিকেই ও চুপি চুপি গিয়ে ইটের খোয়া বুড়োর দোকানের চালে মারবে।
রাত দশটা পঞ্চান্ন মিনিটে চুপি চুপি অনু বাড়ি থেকে বেরিয়ে কানু খুড়োর দোকানের পঁচিশ-তিরিশ মিটার দূরে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে শুরু করল ইটের খোয়া মারা। কানু খুড়োর আবার আছে ভূতের ভয়। খুড়ো ভাবলো ভূত এসে নাচানাচি করছে টিনের ওপরে। ভয়ে কানু খুড়োর প্রাণ বুঝি যায়-যায়! থামছেই না ভূতের নাচন! কানু খুড়ো ভয়ে দিশেহারা হয়ে গেল। খুড়োর মাথায় এক বুদ্ধি এলো, ভাবল এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে ভূত দোকানের মধ্যে ঢুকে আমার ঘাড় মটকাবে! আমাকে পালাতেই হবে। আস্তে আস্তে দোকানের দরজা খুলে খুড়ো দিয়েছে দৌড়। অমনি অন্ধকারের মধ্যে গায়ের ওপর পা লেগেছে ভুলু নামের তেজি কুকুরটির। ভুলু প্রতিদিন স্কুল মাঠের পাশে এখানেই ঘুমায়। যেই বুড়ো ভুলুর পেটের ওপর দিয়েছে পা, অমনি ভুলু দিয়েছে ঘেউ ঘেউ করে জোরসে এক কামড়। এবার বুড়ো ‘মরেছি গো মরেছি’ বলে দৌড়াতে দৌড়াতে গিয়ে পড়েছে মাঠের পাশের পুকুরে। পুকুরে পড়েই খুড়ো চেঁচামেচি শুরু করেছে ‘বাঁচাও গো বাঁচাও, মরেছি গো মরেছি’। আর ভুলু পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করে চলেছে অবিরত। মনে হয় ঘুড়োকে এক কামড় দিয়ে ওর মন ভরেনি, আরও একটা-দুটো দিতে পারলে ভালো হতো। এসব কাণ্ডকারখানা দেখে অনু আর না হেসে পারল না। অনু এবার হো হো করে হেসে উঠলো। খুড়ো এবার চেঁচিয়ে উঠলো-‘কে, ওখানে কে?’ মরো খুড়ো বলেই উচ্চস্বরে হাসতে হাসতে দৌড় দিয়ে বাড়ি পৌছে গেল অনু। কথা শুনেই কানু খুড়োর মনে সন্দেহ হল এটা অনুর কন্ঠস্বর। পরের দিন সকাল বেলা স্কুল খুলতেই খুড়ো অনুর নামে বিচার দিল ইংরেজি শিক্ষক সঞ্জীব বাবুর নিকট। অনু স্কুলে যেতেই সঞ্জীব স্যার অনুকে ডেকে পাঠালেন। জিজ্ঞাসা করতেই অনুর স্পষ্ট জবাব সেই এটা করেছে এবং তার কারণ সুরভী বুড়িকে চাল ওজনে কম দিয়েছে কানু খুড়ো। যাহোক, এবার কোন রকমে বেঁচে গেল অনু, শর্ত পরে যাতে এমনটি আর না করে। যাহোক, ক্লাস শেষে স্কুল ছুটি হল, গাঁয়ের রাস্তা ধরে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটছে অনু ও অভি। এমন সময় পথে দেখা হল ওদের এক সহপাঠী বন্ধু অনয়ের সাথে। অনয় খুব হন্তদন্ত হয়ে ওদেরকে বলল-ওর মা ভীষণ অসুস্থ, এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। অনয়ের বাবা নেই, মা-ছেলে মিলে ওদের সংসার। অনু শুনেই বলল- ‘চল, আমি যাব তোর সাথে’। অনু অভিকেও বলল- ‘তুইও চল’। অভি বলল- ‘না রে, শরীরটা ভাল্লাগছে না, বিকালে প্রাইভেট টিচার আসবে বাড়িতে, আর আগামীকালের অনেক হোমওয়ার্ক আছে- বরং তুই যা, আমি যেতে পারব না’। অনুর মনে মনে খানিকটা রাগ হলেও বেশ ধীর-স্থির ভাবে বলল- ‘ঠিক আছে তুই তাহলে বাড়ি যা, আমিই যাচ্ছি অনয়ের সাথে।' দ্রুত ওরা অনয়দের বাড়িতে পৌঁছে গেল। পৌঁছেই অনয়ের মায়ের ফোন থেকে অনু এম্বুলেন্সের হেল্প লাইনে ফোন করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অনয়দের বাড়ির সামনের গাঁয়ের ভাঙাচোরা রাস্তায় এম্বুলেন্স পৌঁছে গেল। দু’জন মিলে অনয়ের মাকে এম্বুলেন্সে উঠালো। চালক বেশ দক্ষতার সাথে দ্রুত গতিতে এম্বুলেন্স চালিয়ে বাড়ি হতে প্রায় বারো কিলোমিটার দূরে বিশ্বনাথ স্পেশালাইশড হাসপাতালে পৌঁছে গেল। ইর্মাজেন্সি থেকে প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেরে অনয়ের মাকে স্থানান্তর করা হল কার্ডিয়াক বিভাগে। এ যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেন অনয়ের মা। তিনদিন সেখানে ভর্তি থেকে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরলেন অনয়ের মা। ডাক্তার-নার্সরা অনুর এমন বুদ্ধিদীপ্ত ও দায়িত্বশীল আচরণে ভীষণ খুশি হয়ে ওকে ধন্যবাদ জানাল। আর কিছুক্ষণ দেরি হলেই হয়তোবা অনয়ের মাকে বাঁচানো যেত না। এই ঘটনা স্কুলের সবাই জেনে গেলেন। ইংরেজি শিক্ষক সঞ্জীব স্যার অনুকে ডেকে ওর বুদ্ধি ও দায়িত্বজ্ঞানের প্রশংসা করলেন। সঞ্জীব স্যার স্কুলের হেডমাস্টার মশাই-কে প্রস্তাব করলেন, এবার থেকে স্কুলের রেজাল্ট ঘোষণার দিন ‘সেরা মানবিক পড়ুয়া’ নামের একটি পুরস্কার ঘোষণা করার। হেডমাস্টার মশাই সঞ্জীব বাবুর প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন।
অবশেষে, এলো ফলাফল ঘোষণার দিন। সঞ্জীব স্যার মাইকে ঘোষণা করলেন— এ বছর স্কুলের ‘সেরা মানবিক পড়ুয়া’র পুরস্কার পাচ্ছে অনু। স্কুল শুধু বই মুখস্ত করে বেশি নাম্বার পাওয়ার কারখানা নয়। বরং, ছোট ছোট বাচ্চাদের মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রতিষ্ঠান। আর, সেই মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছে আমাদের ছাত্র অনু। অনুর নাম মাইকে শোনার পরে অনুও খানিকটা বিস্মিত হল। তবুও, পুরস্কারটি পেয়ে বেশ উচ্ছ্বসিতই লাগছে ওর। অভি অনুর পাশেই বসে আছে। বরাবরের মতো এবারেও ফার্স্ট হয়েছে। তবে এবার যেন অভির একটু অন্যরকম লাগছে-অনুর স্কুলের ‘সেরা মানবিক পড়ুয়া’ পুরস্কার পাওয়াতে। অনু পুরস্কার হাতে নিয়ে অভির পাশে এসে বসল। কেমন জানি একটু সংকীর্ণতায় চেপে ধরেছে অভির হৃদয়। যে সংকীর্ণতা সে তার বাবা-মায়ের দেওয়া আর্দশগত শিক্ষার মাধ্যমে পেয়েছে, তার পরিবার ও পারিপার্শ্বিকতার মধ্য দিয়ে পেয়েছে, আত্মকেন্দ্রিকতায় ভরপুর সেই শিক্ষা! হয়তোবা, আজকালকের অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী বেড়ে উঠছে এমনই শিক্ষা ধারণ করে। কিন্তু, অভির রেজাল্টে বরাবরই খুশি অনু! যাহোক, সংকীর্ণতা বুকে চেপে অনুকে অভিনন্দন বলল অভি। আর বলে উঠল-চল বাড়িতে যাই।